আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস রচনা (৯২০ শব্দ) | JSC, SSC |

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস রচনার সংকেত (Hints)





  • সূচনা
  • আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের পটভূমি
  • আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি
  • আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের তাৎপর্য
  • উপসংহার:




আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস রচনা





সূচনা:





মা, মাতৃভূমি আর মাতৃভাষা মানব অস্তিত্বের প্রধান তিনটি অবলম্বন। মানুষের পরিচয়ের সেরা কষ্টিপাথর মাতৃভাষা, দেশের ভাষা, জাতির ভাষা। মাতৃভাষার অধিকার মানুষের জন্মগত অধিকারসমূহের মধ্যে অন্যতম। এ অধিকার নিজের মতাে করে কথা বলার অধিকার, স্বতঃস্ফূর্ত চেতনায় উদ্ভাসিত স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার। বাঙালির মাতৃভাষা বাংলা। ১৯৫২ সালের ২১-এ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য জীবন দিয়েছিল বরকত, সালাম, রফিক, শফিক, জব্বার এবং আরও অনেক নাম না জানা বাঙালি। তাদের সে রক্তে রঞ্জিত একুশে ফেব্রুয়ারি এখন বিশ্বজনীন ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃত।





আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের পটভূমি:





আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের রয়েছে একটি গৌরবদীপ্ত ঐতিহাসিক পটভূমি । ১৯৫২ সালের ২১-এ ফেব্রুয়ারিতে পূর্ববাংলার জনগণ বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে বাংলা ভাষায় রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছিল । বাঙালির সেই ঐতিহাসিক ভাষা শহিদ দিবস ২১-এ ফেব্রুয়ারি আজ সারাবিশ্বের ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। ১৪ই আগস্ট, ১৯৪৭-এর পাকিস্তান সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই বাঙালি জাতির চেতনায় বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলনের
তরঙ্গ প্রবাহিত হয়েছিল । তদানীন্তন পাকিস্তান রাষ্ট্রের গােড়াপত্তন ঘটে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে। নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা ছিল বাংলা, কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগােষ্ঠী রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে বাংলা ভাষাকে পাশ কাটিয়ে গােপনে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে ওঠে। যদিও উর্দু ছিল মাত্র ৬ শতাংশ লােকের মাতৃভাষা। সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষাকে উপেক্ষা করে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পাকিস্তানি শাসকদের এ অপপ্রচেষ্টা বাঙালিকে বিদ্রোহী করে তােলে। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার স্বপক্ষে একটি প্রস্তাব পাশ করা হলে পূর্ব পাকিস্তানের জাগ্রত ছাত্রসমাজ এর বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছিল প্রচণ্ড ক্ষোভের সাথে। তবে এ আন্দোলন জোরদার হয় ১৯৪৮ সালে মােহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঘােষণার পর থেকেই। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগােষ্ঠী যতই বাংলা ভাষার বিরােধিতা করতে থাকে ততই বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন জোরদার হতে থাকে। সমগ্র পূর্ববাংলা একই অঙ্গীকারে ঐক্যবদ্ধ হয়। বাঙালি ঘােষণা করেছিল, উর্দুর সঙ্গে সঙ্গে বাংলাকে দিতে হবে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা। কিন্তু পাকিস্তান সরকার এ দাবি না মেনে ঘােষণা করে উর্দু, একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। এ অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তের ফলে সরকার ও ছাত্রসমাজের মধ্যে তুমুল লড়াই শুরু হয়। এরই জের হিসেবে বায়ান্নর ২১-এ ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার আন্দোলনরত নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালায়। অনেক প্রাণের তাজা রক্তে সেদিন রঞ্জিত হয় রাজপথ। এ নৃশংসতা আন্দোলনকে আরও বেগবান করে তােলে, গর্জে ওঠে সারা বাংলা। আতঙ্কিত সরকার বাধ্য হয়ে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এরপর থেকে রক্তাক্ত একুশে ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবস হিসেবে পালিত হয়। সময়ের দাবিতে ভাষা আন্দোলন পরিণত হয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে। একুশের চেতনাই বাঙালিকে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার শক্তি জুগিয়েছে। মাতৃভাষার জন্য। বাঙালির সেদিনের আত্মত্যাগ বিফলে যায়নি। একুশ এখন আর কেবল বাঙালির ‘শহিদ দিবস’ নয়। একুশ এখন সারা বিশ্বের । বিশ্বের ১৮৮টি দেশে ভাষা শহিদদের অভূতপূর্ব আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করা হয় এ দিনে বাঙালির ‘শহিদ দিবস’ এখন বিশ্ববাসীর ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। এককথায়, একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনাজাত প্রয়াসের ফসল ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’।





আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি:





‘৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের গণমানুষের দৃঢ় অঙ্গীকারই বিশ্বসভায় বাংলা ভাষাকে মর্যাদার আসন দিয়েছে সত্যিকার অর্থে মা, মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার প্রতি আমাদের হৃদয়ছোঁয়া আবেগই বাংলা ভাষার বিশ্বায়নে সহায়তা করেছে। ২১-এ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদানের জন্য প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করে কানাডায় বসবাসরত প্রবাসীদের সংগঠন “Mother Language Lovers of the world Society, এর পেছনে যে দু জন বাঙালির কৃতিত্ব সবচেয়ে বেশি তারা হলেন—আব্দুস সালাম ও রফিকুল ইসলাম। তাঁরাই ১৯৯৮ সালের ৯ই জানুয়ারি ২১-এ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘােষণার জন্য জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনানের কাছে একটি আবেদনপত্র পাঠান। সাতটি ভাষার ১০ জন মানুষ এ আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করেন। কফি আনান ইউনেস্কোর সাথে যােগাযােগ করার পরামর্শ জানালে ইউনেস্কোকে একটি আবেদনপত্র পাঠানাে হয়। কিন্তু ইউনেস্কোর শিক্ষা বিভাগের প্রোগ্রাম বিশেষজ্ঞ মিসেস আনা মারিয়া এর প্রত্যুত্তরে বেসরকারি সংগঠনের উদ্যোগে কোনাে প্রস্তাব গ্রহণের অপারগতা জানান। তিনি বলেন, সরকারের মাধ্যমে আবেদন করা হলে ইউনেস্কো তা বিবেচনা করে দেখবে। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমে বিষয়টি জাতিসংঘে উত্থাপিত হয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর ইউনেস্কোর ৩০তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে বাংলাদেশসহ ২৮টি দেশের সমর্থন নিয়ে ২১-এ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এ স্বীকৃতি হচ্ছে মাতৃভাষার জন্য বাংলাদেশের অনন্য ত্যাগের স্বীকৃতি প্রদান। এরই আলােকে ২০০০ সালের ২১-এ ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী পালিত হলাে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বাঙালির ‘শহিদ দিবস’ এখন পালিত হয় ইউনেস্কোর ১৮৮টি সদস্য দেশে এবং ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে ।





আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের তাৎপর্য:





যেকোনাে দেশের শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে সে দেশের মাতৃভাষাতেই। তাই ভাষাই একটি দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক। ইউনেস্কোর সম্মেলনে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ পালনের প্রয়ােজনীয়তা ব্যাখ্যা করে বলা হয়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে ভাষা হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। মাতৃভাষা দিবস কেবল কোনাে দেশ বা জাতির গােষ্ঠী চেতনাকেই সম্মানিত করে না বরং বিশ্বের প্রতিটি জাতির ভাষার প্রতিই মর্যাদা প্রদর্শন করে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’-এর তাৎপর্য হলাে সকল মাতৃভাষাকে বিকশিত হওয়ার সুযােগ দেওয়া, যথাযােগ্য মর্যাদা দেওয়া, বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা, দুর্বল বলে কোনাে ভাষার প্রতি প্রভুত্ব আরােপের অপচেষ্টা না করা, ছােট-বড় সকল জাতির ভাষাকে সমমর্যাদা দান করা। একুশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে কেবল বাঙালির মাতৃভাষার প্রতিই নয়, বিশ্বমানবের আপন ভাষার মর্যাদার দিকটিও এতে শনাক্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে এ দিবস পালনের ফলে বিশ্ব সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ ও বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও মূল্যবােধ সম্পর্কে কৌতূহল সৃষ্টি হচ্ছে। একুশের অনন্য চেতনা বিশ্ববাসীকে নিজ নিজ ভাষাকে ভালােবাসার প্রেরণা জোগাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ পালনের মাধ্যমে আন্তঃরাষ্ট্রীয় নৈকট্য বাড়ছে। বিশ্ববাসীর পদচারণায় আমাদের ভাষা হচ্ছে শক্তিশালী এবং ক্রমবিকাশমান । ভাষার প্রতি বাঙালির আত্মত্যাগ আর ভালােবাসা বিশ্ববাসীকে শিখিয়ে দিল আপন ভাষা, আপন সংস্কৃতিকে ভালােবাসার মন্ত্র। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’-এর তাৎপর্য উপলব্ধি করে ভাষাবিজ্ঞানী ড. হুমায়ুন আজাদ বলেছেন, ‘আমি মুগ্ধ, আমি প্রীত, আমাকে স্বীকৃতি দিয়েছে, আমার প্রাণের কথা আমার ভাষায় জানাতে পারব বলে আমার হৃদয়-স্পন্দন বেড়েছে। সত্যিই গর্বিত আমি।’





উপসংহার:





‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি লাভের পর বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিশ্ব দরবারে লাভ করেছে ব্যাপকতা, পেয়েছে বিশেষ মহত্ত্ব। আন্তর্জাতিকীকরণের মাধ্যমে একুশে ফেব্রুয়ারি পেয়েছে নতুন মহিমা, নতুন গরিমা, নতুন মর্যাদা। ভাষার এ বৈশ্বিক স্বীকৃতি আমাদের দুর্লভ অর্জন । ভাষার প্রশ্নে তাই আমরা আনন্দিত, গর্বিত, তবে আমরা মাতৃভাষাকে ভালােবাসা এবং সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি বিশ্বের সকল মানুষের মাতৃভাষার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করব— এ চেতনায় অঙ্গীকারাবদ্ধ হলেই এ মহান দিবসের সার্থকতা।